এম.এস.আই খান, ঢাবি প্রতিনিধি: প্রতি বছর বহু স্বপ্ন নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা পূর্ণ মেধার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় দেশ সেরা মেধাবীরা। এই মেধাবীদের বড় একটি অংশ রাজধানীর বাইরে থেকে আগত। মফস্বল থেকে বুকে বই আগলে আর চোখে বহু আকাঙ্খিত স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখা এসব শিক্ষার্থীদের ঢাকায় থাকার মত কোন সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়েই   ঠাই নিতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য বিষয় মনোনয়ন দেয়ার সাথে সাথে হল বরাদ্ধ দিলেও হলে আসন দিতে পারে না। ছেলেদের বিজয় একাত্তর হল ব্যতিত বাকি হলগুলোতে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বর্ষের পূর্বে হলে আসন পাওয়া যায় না। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিন্মবিত্ত পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের বাড়তি খরচ গোনার ভয়ে অবস্থান নিতে হয় রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের অধীনে থাকা গণরুমগুলোতে। প্রতিটি হলেই এমন কিছু রুম রয়েছে যেখানে মূলত প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা ঢালাও বিছানা করে থাকে। যেসব রুমে বৈধ ৮ জন শিক্ষার্থী থাকতে পারে অর্থাৎ বেড প্রতি দুজন হিসেবে চারটি বেড পরতে পারে এমন একেকটি রুমে  ৩০ থেকে ৪০ জন গাদাগাদি করে থাকতে হয় এসব গণরুমে। স্যার এ এফ রহমান হলে ০৪ টি, হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলে ১০ টি, মাস্টার দা সূর্যসেন হলে ০৬ টি, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে ০৬ টি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে ০২টি, জগন্নাথ হলে ০৩ টি, পল্লী কবি জসীমউদ্দীন হলে ০৫ টি এবং শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ৫ টি করে গণরুম আছে।  



কোন কোন হলে আবার গণরুমও জোটে না। ফলে থাকতে হয় হলের বারান্দা, ছাদ, মসজিদ, গেমসরুম, টিভি রুম এমনকি খেলার মাঠেও। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ছাত্রদের ঘুমাতে হয় হলের বারান্দা ও ছাদে। অনেক বড় মাপের মানুষ হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে খোলা আকাশের নিচে ঘুমাতে যেয়ে হঠাৎ ঝড়ো বৃষ্টিতে রাতে ঘুমের পরিবর্তে বৃষ্টির জলে নিজেদের চোখের নোনা পানি আড়াল করতে হয় সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের শিক্ষার্থীদের। রিয়াজ নামের একজন শিক্ষার্থী জানান, আমাদের বারান্দায়, ছাদে ও মাঠে ঘুমিয়ে রাত পার করতে হয়। অন্যদিকে দিনের বেলা হলের বারান্দা রৌদ্র তাপে তপ্ত হয়ে উঠে। চোখের অশ্রু যেন ভিতরে থাকতেই বাষ্প হয়ে যায় এ হলের শিক্ষার্থীদের। এখানে রুম পাওয়া যেন ঢাবিতে চান্স পাওয়ার চাইতেও কঠিন ! মশার কামড়ে প্রায়ই ডেঙ্গু জ্বরে ভূগতে হয় এ হলের শিক্ষার্থীদের। হলের বারান্দায় থাকা শিক্ষার্থীরা এ জন্য বারান্দাকে নাম দিয়েছে ডেঙ্গু ব্লক।



অসাম্প্রদায়িক হল হিসেবে খ্যাত ঢাবির বিজয় একাত্তর হলে বিগত দিনে কোন গণরুম না থাকলেও এ বছর থেকে হলটির গেমস রুম গণরুমে পরিণত হয়েছে। হল প্রভোস্ট বেশ কয়েকবার গেমস রুম কে গণরুমে পরিণত করার তৎপরতা বন্ধ করতে চেয়েছেন। কিন্তু প্রতিবারই শিক্ষার্থীরা গণরুম খ্যাত গেমস রুমে ফিরে এসেছে। 



বিজয় একাত্তর হলে অ্যাটাস্ট হওয়া প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মাজহারুল ইসলাম হতাশা প্রকাশ করে বলেন, আমাদের একাত্তর হলে মাত্র ৮০ জন ছাত্রকে আসন দেয়া হয়েছে অথচ অ্যাটাস্ট দেয়া হয়েছে প্রায় ৪০০ জন কে! আমরা মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান আমাদের তো থাকার জায়গা নেই। ফলে একরকম নিরুপায় হয়েই আমাদের কে হলের গেমস রুমে থাকতে হচ্ছে। এখানে ফ্লোরিং করে আমাদের থাকতে হচ্ছে। এই গরমে মাথার উপর একটি ফ্যান পর্যন্ত নেই!



স্যার এ এফ রহমান হলে থাকা চারটি গনরুমের শিক্ষার্থীদের কে ঘুমাতে হয় এক পাশ হয়ে বা কাত হয়ে। গণরুমের ভাষায় যাকে বলা হয় ইলিশ ফালি। রুমগুলোতে পর্যাপ্ত ফ্যান নেই, সাথে ছারপোকা আর মশার যন্ত্রণা তো নিত্য সঙ্গী। এ জন্য শিক্ষার্থীদের অনেকেই মসজিদে ঘুমিয়ে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে ছোট হল হিসেবে পরিচিত এ ছাত্রাবাসে নেই শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত অধ্যায়নের সুযোগও। ছোট রিডিং রুমটিতে সন্ধ্যার আগে জায়গা দখল না দিলে পাওয়া যায় না পড়ার সুযোগ। গণ যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রনি জানান বর্তমানে তার পরীক্ষা চলছে। গণরুমে থাকার কারণে পড়াশুনার সুযোগ পাওয়া যায় না। ফলে পরীক্ষার পূর্ব রাতে অনেক পড়াশুনা করতে হয়। কিন্তু রিডিং রুমে জায়গার স্বল্পতার কারণে মসজিদে বা গণরুমের ভ্যাপসা গরম সহ্য করে পড়াশুনা করে পরীক্ষার হলে যেতে হয়। যা একজন শিক্ষার্থীর মানসিক প্রস্তুতি কে দুর্বল করে দেয়।



হল ভেদে গণরুমগুলোর ধারণক্ষমতা ও অবস্থান ভিন্ন হলেও প্রায় প্রতিটি গণরুমে ছাত্রদের দুর্ভোগের চিত্র এক ও অভিন্ন। সূর্যসেন হল, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল ও জগন্নাথ হলসহ প্রায় প্রতিটি হলের গণরুমের নিত্যকার গণসাথী ছারপোকা, মশা, ফ্যান স্বল্পতা, ভ্যাপসা গরম, রাতে ঘুমানোর জায়গা স্বল্পতা, নিন্মমানের খাবার। গণরুমে জ্বর এবং বসন্ত রোগ যেন সবার পরিচিত। আর ছোঁয়াচে কোন রোগে একজন আক্রান্ত হলে তা ছড়িয়ে পড়ে অন্যদের মাঝে। জুতা-স্যান্ডেল থেকে শুরু করে নিজেস্ব কোন কিছুই গণরুমে খুঁজে পাওয়া যায় না। গণরুমের মধ্যরাতের দৃশ্য দেখলে বিশ্বাস করাই কঠিন হয়ে পড়ে যে, এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস! মনে হবে এটি যেন সিরিয় কোন উদ্বাস্ত শিবির।



ছারপোকা ও মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে এবং জায়গার স্বল্পতার কারণে প্রায় সময়ই নির্ঘুম রাত কাটে এসব গণরুমবাসীর। সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান দিপু জানান প্রায় দিনই তাকে ভোরে ঘুমাতে হয়। রাত কাটিয়ে দেন পলাশী ও ক্যাম্পাসে আড্ডা দিয়ে। এতে অনেকের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে ঠিকই কিন্তু পড়াশুনার বেশ ক্ষতি হয়। শীতের সময় বাইরে থাকার কারণে প্রায়ই ঠান্ডায় আক্রান্ত হয় ছাত্ররা। এ বছরের শুরুর দিকে বাইরে থাকতে যেয়ে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ফরিদপুরের হাফিজ মোল্লা নামে এক শিক্ষার্থী মারা যায়।



মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ সোহেল রানা জানান, গণরুমের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ও ক্যান্টিনের নিন্ম মানের খাবারের কারণে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশ বাধা গ্রস্থ হচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা আশা ভঙ্গের হতাশায় ভোগে। শিক্ষার্থীরা চাইলে মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নিতে পারে, তাদের জন্য আছে মনসিক সাপোর্ট সেন্টার। গণরুমের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ করার পরামর্শ দেন তিনি। 



কিন্তু ক্যান্টিনের খাবার পর্যাপ্ত  স্বাস্থ্যসম্মত নয়, খাবারের তালিকায় নেই ভিন্নতা। প্রতি সপ্তাহে প্রায় একই খাবার পরিবেশন করা হয়। হল ক্যান্টিনগুলোতে এসব খাবারের জন্য ৩০ টাকা থেকে তরকারি ভেদে ৪৫ টাকা পর্যন্ত মূল্য প্রদান করতে হয়। রমজান মাসে সেহেরির জন্য ছাত্রদের গুনতে হয় ৪৫ থেকে ৫০ টাকা করে। খাবারের দাম ও মান নিয়ে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ থাকলেও তেমন কোন ইতিবাচক পরিবর্তন আসে নি হল ক্যান্টিনগুলোর খাদ্য ও মূল্য তালিকায়। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান লাভলু বলেন, গণরুমে থাকতে অনেক কষ্ট হয়। ক্যান্টিনের খাবারও ঠিকমত খেতে পারি না। কিন্তু তারপরেও পরিবার এবং বাইরের মানুষ কে হাসি মুখে বলি, ভাল আছি। এ যেন ক্রীতদাসেরর হাসি।



গণরুমের প্রতিটি ছাত্রকে কোন না কোন রাজনৈতিক গ্রুপের অধিনে থাকতে হয়। দিনের বেলা সেই অধিনস্ত গ্রুপের রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অংশনিতে হয়। আর রাতে উপস্থিত থাকতে হয় গেস্ট রুমে। গেস্ট রুম বলতে সাধারণত অতিথি কক্ষ বুঝালেও ঢাবি ক্যাম্পাসে গেস্ট রুমের ভিন্ন অর্থ রয়েছে। মূলত নির্দিষ্ট একটি রুমে নির্দিষ্ট সময়ে গণরুমের সকল সদস্য কে উপস্থিত থাকতে হয়। সেখানে দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের কে ক্যাম্পাসে কি ভাবে থাকতে হবে, ক্যাম্পাসের ও হলের বিভিন্ন নিয়ম-কানুন,  রাজনৈতিক কর্মকান্ডে কি ভাবে সক্রিয় হওয়া যায় এসব বিষয় শিখিয়ে থাকে। অনেক হলেই বেশ কঠোরতার সাথে  গেস্ট রুম করানো হয়। ছাত্রদের অনেকেই শুধুমাত্র একটি সিট প্রাপ্তির প্রত্যাশায় দিনের পর দিন  রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অংশ নিয়ে থাকে। বিভিন্ন সময়ে গেস্ট রুম নিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনা চললেও গেস্ট রুম নিয়ে শিক্ষার্থীরা খোলামেলা কথা বলতে রাজি হয় নি। কয়েকজন রাজি হলেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।



দীর্ঘ দিনের আসন সংকটে জর্জড়িত প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত দেশের শ্রেষ্ঠ এ বিদ্যাপীঠ তার বিদ্যার্থীদের জন্য সুষ্ঠ সমাধানের ব্যবস্থা করবে এমনটাই প্রত্যাশা হাজারো শিক্ষার্থীর। 



 



উল্লেখ্য,  লেখাটি একই সাথে জাতীয় দৈনিক যুগান্তরের প্রতিমঞ্চ ৭ জুন '১৬ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।



 



 



 



 



 



 



 



 



 



বিএমটিঅাই নিউজ ডটকম / এম এল / এম সি


আপনার মন্তব্য
এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
০৩ ডিসেম্বর ২০১৭
বিত্রমটি আই নিউজ ডেস্ক
নাটকের গল্পে ৯ বছর বয়সি অলির চরিত্রটি রূপায়ন করেছে শান্ত নামের এক ছেলে। মজার ব্যাপার হলো- সবাই এখন শান্তর সঙ্গে সেলফি বিস্তারিত
২৯ নভেম্বর ২০১৭
বিত্রমটি আই নিউজ ডেস্ক
ফের ক্যামেরার সামনে নগ্ন হলেন সাবেক পর্ন তারকা সানি লিওন। কিন্তু এবার একদম ভিন্ন কারণে নগ্ন হলেন তিনি। তবে তিনি একা ছিলেন বিস্তারিত
২৮ নভেম্বর ২০১৭
বিত্রমটি আই নিউজ ডেস্ক
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে আবারও মাশরাফি বিন মর্তুজার ব্যাটে জয় পেয়েছে রংপুর রাইডার্স। শেষ চারে উঠার লড়াইয়ে মঙ্গলবার দিনের প্রথম ম্যাচে সিলেট বিস্তারিত
© স্বত্ব বিএমটিআইনিউজ ২০১৫ - ২০১৭
সম্পাদক :
মিঞা মুজিবুর রহমান
নির্বাহী সম্পাদক : শাহআলম শুভ
৩৭৩,দিলু রোড (তৃতীয় তলা)মগবাজার, ঢাকা-১২১৭
ফোন: ০২৯৩৪৯৩৭৩, ০১৯৩৫ ২২৬০৯৮
ইমেইল:bmtinews@gamil.com